Spread the love

সর্বপরি চাই যথেষ্ট সংখ্যক চরিত্রবান মানুষ। তা না হলে আমরা যা কিছুই করি না কেন জীবনের সর্বস্তরে সমস্যার সম্মুখীন হব। সে সমস্যা হতে পারে ব্যক্তিগত অথবা সমষ্টিগত, জাতীয় অথবা আর্ন্তজাতিক। তাই সব কিছু করা আর চরিত্র গঠনের জন্য কিছু্ই না করা সমস্যা সমাধানের জন্য বিচক্ষণতা অথবা বু্দ্ধির কাজ নয়।

আমাদের মধ্যে যখন যথেষ্ট সংখ্যক চরিত্রের অভাব ঘটবে, তখন শক্তি অপেক্ষা দূর্বলতা, সৌভাগ্য অপেক্ষা দূর্ভগ্য, সুখ অপেক্ষা দু:খ বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যৎ অপেক্ষা অতীতটাই বোধ হবে অধিক গৌরবময়।

চরিত্রের অভাব হলে, আমাদের শত্রুরা বন্ধুদের চেয়ে বেশি শক্তিমান হয়ে উঠবে, শান্তির চেয়ে যুদ্ধই বেশি করে আসবে, নিরাময়বিধানের চেয়ে হানাহানি বেড়ে উঠবে। চরিত্রের অভাবে, আমাদের ট্রেনগুলি সময়মত চলবে না, কলকারখানায় ক্ষমতার অনুরূপ উৎপাদন হবে না, শিল্পসংস্থাগুলো ভেঙ্গে পড়বে আর শস্যক্ষেত্রগুলো হতে আমরা আশঅনুরূপ ফসল পাবো না। পূজার মন্দির হয়ে উঠবে বিকিকিনির বাজার, বিদ্যালয় হবে ডিগ্রী তৈরীর কারখানা। চরিত্রের অভাব হলে , যা পূর্ণতা দিতে পারত তাকে সরিয়ে রাখব দূরে এবং যা আমাদের ধ্বংস করতে পারে তাকে গ্রহণ করব একান্ত আশ্লেষে। চরিত্রের অভাব হলে, আমাদের বাঁধ রুখতে পারবে না বন্যার জল, নদীর উপর সেতু পড়বে হুমড়ি খেয়ে, জাতীয় সড়কের বুকে বিস্তৃত হবে করার গহ্বর, যার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে অসতর্ক যানবাহন আর মানুষ।

চরিত্রের অভাব হলে, যৌথ নিগমগুলি দলবাজির আখড়ায় পরিণত হবে, রাস্তা-ঘাটে জমবে আবর্জনার স্তূপ, অফিস-আদালতে হবে দীর্ঘসূত্রিতার আবাসভূমি। চরিত্রের অভাব হলে, নেতারা হবে নেতৃত্বের দালাল, রাজনৈতিক দলগুলি উপদলে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হবে, পুরোহিতরা হবে ধুরন্ধর ব্যাপারী আর ব্যবসাদারেরা অবাধে খদ্দেরের গলায় চালাবে শাণিত ছুরি। চরিত্রের অভাব হলে, জনহিতকর কাজের চেয়ে অপরাধমূলক ক্রিয়াকলাপ, সুরক্ষিত স্থান অপেক্ষা অরক্ষিত স্থান এবং বিশ্বাসী অপেক্ষা অবিশ্বাসী লোকের সংখ্যা বেড়ে যাবে। চরিত্রের অভাব হলে, যুবসম্প্রদায় হবে অসংযত, যার ফলে, সরকারের প্রয়োজন হবে আরও বেশি সংখ্যায় মানসিক ব্যাধির চিকিৎসালয় খোলার।

চরিত্র না থাকলে সংস্কৃতির নামে চলবে ভাঁড়ামি, শিল্পে ঘটবে রুচির বিভাব, সাহিত্যৈ প্রকাশ পাবে নির্লজ্জ ইন্দ্রিয়পরায়ণতা।

চরিত্রের অভাব হলে , সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধির বদলে আসবে অশান্তি আর আন্দোলন, বিবাদ ও বিসংবাদ। সততা আর ন্যায় বিবাদ নেবে, আসবে দুর্নীতি আর স্বজন-পোষণ, অন্যায় আর অবিচার। চরিত্রের অভাব হলে আমরা অর্থের জন্য এমন সব কুরুচিকর নিম্নশ্রেণীর জিনিসপত্র বাজারে বিক্রি করব অথবা তার প্রশ্রয় দেব যা সাধারণ মানুষের বিশেষ করে আমাদের ছেলে মেয়েদের রুচির বিকার ঘটায়। চরিত্রের অভাব হলে ধর্ম পরিণত হবে অন্তঃসারহীন অসার অনুষ্ঠানে, নৈতিক অনুশাসনসমূহ লঙ্ঘিত হবে মিথ্যা যুক্তিতর্কের জটিলতায়। নিঃস্বার্থ সমাজ সেবা পরিণত হবে স্বার্থসিদ্ধিমূলক সমাজসেবায় আধ্যাত্মিকতা পরিণত হবে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতায়। সেই ধর্ম শূন্যতা থেকে আসবে ভোগসুখবাদ। সেই ভোগসুখবাদ আনবে ধ্বংস,যা মৃত্যুর চেয়েও নির্মম,নিশ্চিত।

চরিত্রের অভাব হলে, ছাত্রাবস্থায় পাঠে ঘটবে না মনোনিবেশ, পাঠ্যবিষয়ের বহির্ভূত বিষয়ে মন হবে আকৃষ্ট । এমন সব চিন্তা ও কার্যে মন ব্যাপৃত থাকবে যা উদ্ভিন্ন জীবন-কুসুমটি পূর্ণরূপে প্রস্ফুটিত হবার আগেই্ অকালে শুকিয়ে যাবে। জীবন যুদ্ধের কঠিন বাস্তব ভূমিতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করব নিজের অসারত্ব। তখন নির্লজ্জের মতো অপরের স্কন্ধে ভারার্পন করে আসন্ন বিপ্লবের স্বপ্ন দেখব।

চরিত্রের অভাব হলে, আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি নিয়োজিত হবে অপরের ক্ষতি সাধনে- মুখে কৃত্রিম ভদ্রতার মুখোশ এঁটে। অগাধবুদ্ধি খরচ হবে তুচ্ছ প্রাপ্তির সম্ভাবনায় এবং আমাদের সব বড় বড় যোজনা প্রসব করবে অকিঞ্চিৎকর ফল।

চরিত্রের অভাব হলে, কোন প্রকার সঠিক চিন্তাধারা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আর ভ্রমপূর্ণ অসৎ চিন্তারাজি থেকে আকাঙ্খিত শুভফল লাভ করা কেমন করে সম্ভব? চিরত্রের অভাব হলে, আমরা অতিত অথবা ভবিষ্যতের চিন্তায়ই সর্মদা বুঁদ হয়ে থাকব, বর্তমান নিয়ে কদাপি নয়। আত্মোন্নতির চেষ্টা অথবা সংগ্রামের পথে না গিয়ে নিয়োজিত হবে পূতিগন্ধময় সংসারের নেতিবাচক সমালোচনায়।

চরিত্রের অভাব হলে, আমাদের বিবাহ সম্বন্ধ হবে বালির বাঁধ, গৃহকোণ হবে সাপের বিবর, সন্তান সন্ততি হবে ধূর্ত শৃগাল এবং মানবিক সম্পর্ক হবে স্বার্থপরতা অর্জনের কৌশল বিশেষ। ফলে সমাজে বৃদ্ধি পাবে গৃহ পরিত্যক্ত শিশুর সংখ্যা, বৃদ্ধি পাবে অপরাধী, শঠ, জোচ্ছোর, পাগল এবং মানববিদ্বেষীদের দল।

চিরত্রের অভাব হলে, গণতন্ত্রের প্রশাসন যন্ত্রে এমন সব শাসক শ্রেণীর আবির্ভাব হবে যে, লোকে অতিষ্ঠ হয়ে কামনা করবে একনায়কতন্ত্রের শাসক। চরিত্রের অভাব হলে, খাদ্য উৎপাদন হিসেবমতো যথেষ্ট হলেও প্রত্যেকের কাছে তা পৌঁছাবে না। চরিত্র বিলীন হবার সাথে সাথে সমস্ত খাদ্যসম্ভারও বিলীন হয়ে যাবে মহাশূন্যে।

চরিত্রের অভাব হলে, আমাদের আপাত ‘উন্নতি’ হবে আসলে অবনতি, আমাদের সমৃদ্ধিকে আমরা নিজেরাই নষ্ট করব এবং আমাদের জটিল সমস্যাপ্রসূত দুঃখের কোন সীমা পরিসীমা থাকবে না। চরিত্রের অভাব হলে, সর্বত্র বিরাজ করবে কদর্যতার পরিবেশ। আমাদের মুখমন্ডল হারাবে তার ঔজ্জ্বল্য, চক্ষু হারাবে তার দীপ্তি, হৃদয়ে থাকবে না আশা, মনে থাকবে না দৃঢ়প্রত্যয়ের শক্তি, অন্তরে থাকবে না এতটুকুও আনন্দের রেশ।

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.