Spread the love

উত্তর : –  নিজের ঈশ্বরানুরাগ বাড়াবার জন্য, তা জাগ্রত করার জন্য এবং ভগবানকে প্রসন্ন করার জন মূর্তিপূজা করা উচিত। আমাদের অন্তঃকরণে সংসারের যে বিশেষ রূপ অঙ্কিত আছে, যে মমতা-আসক্তি ইত্যাদি আছে, তা দূর করার জন্য ঠাকুরের পূজা করা উচিত। ফুলমালা দিয়ে সাজানাে, সুন্দর বস্ত্রাদি পরানাে, আরতি করা, নৈবেদ্য নিবেদন করা ইত্যাদির খুবই প্রয়ােজন আছে। অর্থাৎ মূর্তিপূজার দ্বারা আমাদের দুই প্রকার লাভ হয়-ভগবদ্ভাব জাগ্রত হয় তথা বৃদ্ধি পায় এবং সাংসারিক বস্তুর প্রতি মমতা ও আসক্তি দূর হয়।

মানুষের জীবনে অন্ততঃ এমন একটি আশ্রয় থাকা প্রয়ােজন যার জন্য সে নিজের সব কিছু ত্যাগ করতে পারে। সেই স্থান হতে পারে ভগবান বা কোন সাধুমহাত্মা বা হতে পারে মাতা-পিতা বা আচার্য শিক্ষক। এর ফলে মানুষের পার্থিব চিন্তা কমে যায় এবং ধার্মিক তথা আধ্যাত্মিক ভাবনা বাড়ে।

একবার কয়েকজন তীর্থযাত্রী কাশী পরিক্রমা করেছিলেন। সেখানকার এক পাণ্ডা যাত্রীদের মন্দিরের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছিলেন, শিবলিঙ্গকে প্রণাম করাচ্ছিলেন এবং পূজাআচ্চা করাচ্ছিলেন। সেই যাত্রীদের মধ্যে কিছু আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গীর ছোকরা ছিল। তাদের স্থানে স্থানে প্রণাম ইত্যাদি করা পছন্দ হচ্ছিল না। সেইজন্য তারা পাণ্ডাকে বলল, “পাণ্ডাজী, স্থানে স্থানে মাথা ঠুকে কি লাভ?’ সেখানে এক সাধু দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি তাদের বললেন, ‘ভাই, যেমন এই হাড়-মাংসের মধ্যে তােমরা আছ, এই মূর্তির মধ্যে তেমনি ভগবান আছেন। তােমাদের বয়স তাে অল্প, কিন্তু এই শিবলিঙ্গ বহু বছরের, সূতরাং বয়সের দৃষ্টিতে এই শিবলিঙ্গ তোমাদের থেকে বড়। শুদ্ধতার দৃষ্টিতে দেখলে হাড়-মাংস অশুদ্ধ কিন্তু পাথর শুদ্ধ। স্থায়িত্বের কথা ভাবলে হাড়ের থেকে পাথর অনেক বেশি মজবুত। যদি পরীক্ষা করতে চাও তাে। নিজের মাথা পাথরে ঠুকে দেখতে পারাে তােমাদের মাথা ভাঙ্গে, না মূর্তি! তোমাদের অনেক প্রকারের দুর্গুণ বা দুরাচার থাকতে পারে, মূর্তিতে কিন্তু কোন দুর্গুণ বা দুরাচার নেই। তাই যে ভাবেই দেখ না কেন মূর্তি সব প্রকারেই শ্রেষ্ঠ। সুতরাং মূর্তি পূজনীয়। তােমরা তােমাদের নামের নিন্দাকে নিজের নিন্দা এবং নামের প্রশংসাকে নিজের প্রশংসা বলে মনে কর; শরীরের অনাদরে নিজেদের অনাদর এবং শরীরের আদরে নিজেদের আদর বলে মনে কর। তাহলে মূর্তিতে ভগবানের পূজা, স্তুতি প্রার্থনা ইত্যাদি করলে ভগবান কি সেই পূজা স্তুতি- প্রার্থনাকে গ্রহণ করেন না ? আরে ভাই! লােকে তোমার যে নাম ও রূপের সম্মান করে, তা তােমার স্বরূপ নয়, তবু তাতে তুমি খুশী হও। ভগবানের স্বরূপ তাে সর্বব্যাপী, অতএব এই মূর্তিতেও তাঁর স্বরূপ বিরাজিত। কাজেই আমরা যদি এই মূর্তিকে পূজা করি, তবে কি তিনি প্রসন্ন হবেন না? আমরা যত বেশী আন্তরিকতায় তাঁর পূজা করব, তিনি ততো বেশী প্রসন্ন হবেন।’

কোন আস্তিক ব্যক্তি যদি মূর্তিপূজায় অনিচ্ছুকও হন তবুও তার দ্বারা প্রকারান্তরে মূর্তিপূজা হয়ই। কেমন করে? তিনি যদি বেদাদি গ্রন্থ মানেন এবং সেই অনুযায়ী চলার প্রয়াস করেন, তাহলে প্রকারান্তরে তাঁর দ্বারা মূর্তিপূজাই হয়। কারণ বেদও (লিখিত পুস্তক হিসাবে) তাে মূর্তিই। বেদ ইত্যাদি গ্রন্থকে সম্মান জানানােও একপ্রকার মূর্তিপূজা। এই রূপেই মানুষ গুরু, মাতাপিতা-অতিথি প্রমুখের যে সম্মান করে ও সৎকার করে, অন্ন-জল-বস্ত্রাদি দ্বারা সেবা করে-এসবই মূর্তি পূজা। কারণ গুরু, মাতা-পিতা প্রমুখের দেহ জড় হলেও সেই দেহকে সম্মান জানালে তাদেরই সম্মান জানানাে হয়। ফলে তারা সন্তুষ্ট হন। এর তাৎপর্য হল এই যে, মানুষ যখন কাউকে কোনরূপে সম্মান বা সৎকার করে তা মূর্তি পূজারই নামান্তর হয়ে ওঠে। মানুষ যদি ভাবদ্বারা মূর্তিতে ভগবং পূজন করে তা হলে তাও ভগবানেরই পূজা হয়।

এক বৈরাগী বাবাজী ছিলেন। তিনি একটি বারান্দার তলায় থাকতেন ও সেইস্থানেই শালগ্রাম শিলার পূজা করতেন। যারা মূর্তিপূজা মানতাে না তাদের বাবাজীর মূর্তিপূজাদির ক্রিয়াকলাপ পছন্দ হতাে না। সেইসময় সেখানে হুক সাহেব নামে একজন ইংরেজ অফিসার এসেছিলেন। সেই অফিসারের কাছে অন্যান্য ব্যক্তিরা নালিশ করল যে, এই ব্যক্তি মূর্তিপূজা করে সর্বব্যাপী পরমাত্মার অপমান করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। হুক সাহেব ক্রোধান্বিত হয়ে বাবাজীকে ডাকলেন এবং তাঁকে সেই স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন। পরের দিন বাবাজী হুক সাহেবের এক মূর্তি তৈরী করে সারা শহর ঘুরতে লাগলেন। সবাইকে দেখিয়ে সেই মূর্তিতে জুতো মারতে লাগলেন এবং বলতে থাকলেন যে, হুক সাহেব একেবারে বেআক্কেল, এর কোন বুদ্ধিশুদ্ধি নেই ইত্যাদি। লােকেরা তাই দেখে আবার হুক সাহেবের কাছে গিয়ে নালিশ করল যে, বাবাজী তাকে গালি দিচ্ছেন এবং তার মূর্তি তৈরী করে তাতে জুতাে মারছেন। হুক সাহেব বাবাজীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি আমার অপমান করছ কেন ?’ বাবাজী বললেন, আমি আপনার কোনরকম অপমান করিনি, আমি তাে এই মূর্তির অপমান করছি, কেননা এ বড় মূর্খ।’ এই বলে তিনি আবার মূর্তিতে জুতাে মারলেন। হুক সাহেব বললেন, “আমার মূর্তিকে অপমান করা মানেই আমার অপমান করা। বাবাজী বললেন, আপনি এই মূর্তিতে অবস্থিত নন তবুও শুধুমাত্র উপলক্ষরূপে মূর্তির অপমান করলে তার প্রভাব আপনার উপর পড়েছে। আমার ভগবান সর্বত্র, সর্বকালে সর্ববস্তুতে বিরাজিত। সুতরাং কেউ যদি শ্রদ্ধাপূর্বক তার মূর্তিতে পূজা করে তাহলে ভগবান কি প্রসন্ন হন না ? আমি যদি মূর্তিতে ভগবানকে পূজা করি তবে তাতে তার সম্মান করা হয়, না অসম্মান ?’ হুক সাহেব বললেন, “যাও, তুমি এখন থেকে স্বাধীনভাবে মূর্তিপূজা করতে পারাে। বাবাজী নিজ স্থানে গমন করলেন।

 

সূত্র- গীতা দর্পন (উত্তর দিয়েছেন রামসুখ দাসজী)

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.