Spread the love

মহা সমারোহে কংসরাজের দরবারে ধনুর্যজ্ঞাদি ও মহামল্লযুদ্ধ অনুষ্ঠান ছলে ষড়যন্ত্রকারী কংস কৃষ্ণকে হত্যা করবার জন্যই অক্রূরকে দিয়ে বৃন্দাবন থেকে কৃষ্ণ ও বলরামকে নিয়ে এসেছিল। দুরাচারী কংসকে বধ করা এবং মা দেবকী ও পিতা বসুদেবকে কারামুক্ত করা এবং বন্দী উগ্রসেনকে মথুরার রাজসিংহাসনে পুণরায় বসাবার জন্য কৃষ্ণ মথুরাতে আসেন। মথুরাবাসী ভক্তগণ বিশেষরূপে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন কবে দৈববাণী নির্ধারিত সেই ব্যক্তিটির আগমন হবে যে কংসকে উচ্ছেদ করবে, তাকেই আমরা এ জীবনে দর্শন পেতে চাই। সত্যি সেই দিন এসে গেল। কৃষ্ণ ও বলরাম মথুরা নগরীতে প্রবেশ করলেন। সবাই সেই সংবাদ পেয়ে কৃষ্ণ-বলরামকে সাদর অভ্যর্থনা জানাতে লাগল। মথুরাপুরে দুরাচারী কংসের বিনাশ হলে দেবকী বসুদেব অন্ধক প্রভৃতি অসংখ্য স্নেহপরায়ণ আত্মীয়স্বজন কৃষ্ণের স্তুতি করতে লাগলেন। মাতৃস্থানীয়া রমণীয়া কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করতে নিজ কোলে নিয়ে ক্রন্দন করতে শুরু করলেন। বসুদেবও আনন্দে কাঁদতে লাগলেন। পুত্র পুত্র বলে কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করতে লাগলেন। তারপর বলরাম ও কৃষ্ণকে বসুদেব বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলতে লাগলেন, হে বৎস, তোমরা আমার পুত্র। তোমাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আজ আমার জন্ম সার্থক হলো। আমার জীবন ধন্য হলো।

বসুদেব-দেবকীর স্নেহ-ক্রন্দন ও আনন্দ দর্শন করে মথুরাবাসী আনন্দিত হয়ে কৃষ্ণকে প্রণতি জানিয়ে বললেন, হে কৃষ্ণ, আজ আমাদের আনন্দের সীমা নেই। আজ মল্লযুদ্ধে দুরাত্মা কংসের নিপাত হয়েছে। হে কৃষ্ণ! এখন আমাদের সবার প্রতি প্রীত হউন। আমাদের এ জনসাধারণের মধ্যে আপনার কাছে একটি প্রস্তাব নিবেদন করি, তা হলো, দেবকী দেবী যে দিন আপনাকে প্রসব করেছেন, সেই দিনটি সম্বন্ধে আমরা কিছুই নির্ধারণ করতে পারি না। সেই দিন আপনার জন্ম-উৎসব আমরা সম্পাদন করব। আপনি আমাদের অনুমতি প্রদান করুন। হে কৃষ্ণ! আমরা ভক্তি সহকারে আপনার শরণ গ্রহণ করলাম, আমাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করুন। সেই কথা শুনে বসুদেব বলরাম ও কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে- আনন্দে রোমাঞ্চিত হলেন। তারপর তিনি কৃষ্ণকে বললেন, সমস্ত লোকেরই এরকম হোক, তুমি যথাযথ আজ্ঞা প্রদান করো। পিতার অনুমতি অনুসারে মথুরা নগরীতে কৃষ্ণ সবার মাঝে ঘোষণা করলেন। হে মানবগণ! সূর্য সিংহরাশিতে গমন করলে আকাশে মেঘ উদয় হলে ভাদ্র মাসে কৃষ্ণাষ্টমীতে অর্ধ নিশাভাগে বৃষ রাশিস্থ শশধরে রোহিনী নক্ষত্রে পিতা বসুদেব ও মাতা দেবকীর কোলে আমার জন্ম হয়। আপনাদের প্রতি প্রীতিবশে আমি আজ থেকে অনুমোদন করলাম- পৌরগণ এবং অন্যান্য ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র প্রভৃতি অপরাপর ধর্মালম্বীগণ আট থেকে আশী বছর বয়স অবধি আবাল বৃদ্ধ বনিতা আমার এ জন্ম তিথি ব্রত সাধন করুক। এ ব্রত করলে সবার শান্তি আনন্দ ও নীরোগ হবে।

কৃষ্ণের সেই কথা শুনে সমস্ত লোক জন্মাষ্টমীর দিন উপবাস ব্রত করে কৃষ্ণপ্রীতি সাধনের উদ্দেশে কৃষ্ণগান, কৃষ্ণকথা, যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে লাগল। মধ্যরাত্রি পর্যন্ত মহাসমারোহে নানাবিধ মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান চলতে লাগল। মথুরাবাসীরা কৃষ্ণকে নানা উপহার সামগ্রী দান করতে লাগল। দেবকী বসুদেবের বন্দনা করতে লাগল। দেবকী-বসুদেব উপস্থিত ব্রাহ্মণ পুরোহিত, গায়ক বাদক, স্তবকারী, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সবাইকে ধন বস্ত্র প্রভৃতি দান করতে লাগলেন।

বিষ্ণুরহস্যে লিখিত আছে, যে ব্যক্তি জন্মাষ্টমী ব্রত করতে বিমুখ, সে ভীষণ বনের মধ্যে সর্প হয়ে বাস করবে। তাছাড়া ইহলোকে ও পরলোকে তার সুখ নেই। নারকীয় যাতনা তার ভাগ্যে থাকে।

ভবিষ্যোত্তর পুরাণে উল্লেখ আছে, শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠির মহারাজকে বলছেন, একটি মাত্র জন্মাষ্টমীর উপবাস করলে সাত জন্মের অর্জিত পাপরাশি থেকে মুক্তি লাভ হয় এবং সন্তান সন্ততি, আরোগ্য ও অতুল সৌভাগ্য লাভ হয়। জন্মাষ্টমী পরায়ণ ব্যক্তিদের বংশে রূপবান ও হৃদয়বান মহাত্মার জন্ম হয়।’ কলকাতার কৃষ্ণভক্তি পরায়ণ গৌরমোহন দে ও রজনী দেবী জন্মাষ্টমী দিনে নিজগৃহে রাধাগোবিন্দ সেবায় যুক্ত ছিলেন। পরদিনই তাঁদের পুত্র স্বরূপে জন্মগ্রহণ করেন এক হৃদয়বান মহাত্মা শ্রীঅভয়চরণ।

ভবিষ্যোত্তর পুরাণে আরো বলা হয়েছে, জন্মাষ্টমীতে স্নান, দান, হোম, স্বাধ্যায়, জপ, তপ প্রকৃতি যে কোনো কার্যের অনুষ্ঠান করা যায়, সেই সমস্ত শতগুণ ফলপ্রদ হয়। ব্রহ্মপুরাণে পূর্বখণ্ডে জন্মাষ্টমী মাহাত্ম্যে শ্রীসূত গোস্বামী বলেছেন শ্রীকৃষ্ণাষ্টমী হলো বৈষ্ণব তিথি। ঐ তিথির স্মরণ গ্রহণ করলে কলিযুগের মানুষ বিশুদ্ধ হয়।

আমাদের সমাজে জন্মাষ্টমী ব্রত উপবাস কেউ কেউ আগের দিন কেউ কেউ পরের দিন করেন। কোন দিন কর্তব্য, সেই ব্যাপারে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে ভোরের বেলা একটু সপ্তমী আর সারা দিন-রাত অষ্টমী তিথি থাকলেও ঐ সপ্তমী যুক্ত অষ্টমী তিথিতে ব্রত উপবাস একেবারেই নিষিদ্ধ। বরং পরের দিন ভোর পর্যন্ত অষ্টমী তিথি, তারপর সারা দিন-রাত নবমী থাকলেও সেই দিন নবমী যুক্ত অষ্টমী তিথিই ব্রত পালনের উপযুক্ত বলে গ্রহণ করতে হবে। আর রোহিনী নক্ষত্রযুক্ত সপ্তমী বিরহিত শুদ্ধ অষ্টমী যদি হয়, সেই অষ্টমী পরদিন ভোর অবধি থাকলেও পূর্ব দিনেই ব্রত উপবাস করতে হয়। কিন্ত সপ্তমী যুক্ত অষ্টমীর দিন জন্মাষ্টমী ব্রত উপবাস পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.